Monday, August 8, 2022
Homeজাতীয়জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি

জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। পর্যাপ্ত গ্যাস ও ডিজেলের অভাবে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ দাবি করছে, রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য নিয়ে চরম অস্থিরতা চলছে। এ অবস্থায় সরকার চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস আমদানি করতে না পারায় শিল্পে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পাওয়ায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেশনিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের অভাবে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো শিপমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এই গরমে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।

এদিকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারলেও ঈদের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উচ্চমূল্যে জ¦ালানি আমদানির কারণে সরকারকে প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনতেই বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে স্ট্যাটাস দিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হওয়ায় অনেক জায়গাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ আবার স্বাভাবিক হবে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান জানান, পেট্রোবাংলা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অল্প সময়ের মধ্যেই গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার একটি সূত্রে জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ধারণার চেয়ে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ করেছে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহে স্পট মার্কেট থেকে যে এলএনজি কেনা হয় ইউনিটপ্রতি (এমএমবিটিইউ) ২৫ ডলারে; তা এখন বেড়ে প্রায় ৪০ ডলার হয়েছে। দামের এই বিশাল তারতম্যের কারণে লোকসান কমানোর জন্যই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করা হয়েছে। এ কারণে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কমে গেছে। এক সপ্তাহ ধরে দেশে গ্যাসের সরবরাহ দিনে ৩৫ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট কমেছে। গত ২০ জুন পেট্রোবাংলা দিনে ৩১৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া যায় ৮৩ কোটি ঘনফুট। আবার গত ৩০ জুন পেট্রোবাংলা ২৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করেছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে পাওয়া গেছে প্রায় ৬২ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ পড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে দেশের সার্বিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায়।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণ তুলে ধরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বর্তমানে গ্যাসের তীব্র সংকট রয়েছে। গ্যাস স্বল্পতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে জ্বালানির বিশ্ববাজার এখনো অস্থির। এ অবস্থায় কাক্সিক্ষত পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে পারছে না সরকার। তারপরও শিল্পের সরবরাহ কমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে।

ঢাকা পাওয়ার ডেভলপমেন্ট কোম্পানির (ডিপিডিসি) মহাব্যবস্থাপক বিকাশ দেয়ান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় সমস্যার কারণে আমরা সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা হচ্ছে। পিক আওয়ার দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত আমাদের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই চাহিদার বিপরীতে আমরা পাচ্ছি ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অফপিক আওয়ারে সন্ধ্যায় আমাদের ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমরা পাচ্ছি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দিনের বেলায় ৪০০ এবং রাতের বেলায় ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি থেকেই যায়। এই ঘাটতি মেটানোর জন্যই আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবে লোড শেয়ার করছি। তাই কোথাও কোথাও কিছুক্ষনের জন্য লোডশেডিং হচ্ছে। পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ না পেলে আমরা তো নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহ করতে পারব না। তাই কোনো এলাকায় কখন লোডশেডিং হবে তা গ্রাহকদের আগেভাবে জানিয়ে দেয়ার জন্য উপায় খুঁজছি।

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রচণ্ড গরমের কারণে সারাদেশে ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এর বিপরীতে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গিয়ে পিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো ও পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীন সমিতিগুলোকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। গ্যাসভিত্তিক এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে পুরোপুরি সক্ষম এবং প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি না পাওয়ায় উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই হঠাৎ করেই বিদ্যুতের এই সংকট তৈরি হয়েছে।

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও ঈদের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উচ্চমূল্যে জ¦ালানি আমদানির কারণে সরকারকে প্রতিদিন ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনতে হচ্ছে। দিন দিন লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলছে। এই বিপুল পরিমাণ লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনতেই বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা হবে।

এদিকে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েছে। ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, রংপুর, রাজশাহী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ অনেক এলাকায় বিদ্যুতের অভাবে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। শিল্প এলাকাগুলোতে রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো শিপমেন্ট নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য কারখানায় উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় অধিকাংশ সময় কারখানা বন্ধ থাকছে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments